sahri & iftar time

ক্বুরবানীর সার সংক্ষেপ

ক্বুরবানী হলো এক বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ক্বুরবানীর ইতিহাস খুবই প্রাচীন যেমন মানব সভ্যতা প্রাচীন তেমনি ক্বুরবানীর ঘটনা অর্বাচীন। মূলত আদম (আঃ) এর যুগ থেকে এবং পরবর্তীতে ইব্রাহীম (আঃ) এর সন্তান ক্বুরবানী করার ঐতিহাসিক ঘটনা দেখতে পায়, একটি বিশেষ মর্যাদা এবং বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তাৎপর্যপূর্ণ এ ক্বুরবানী মধ্যে নিহিত, কেননা ইব্রাহীম (আঃ) আল্লাহ্ সুবহানাতায়ালা জীবনের সবচাইতে প্রিয় জিনিস তথা পুত্র ইসমাঈল (আঃ) কে তার স্বতঃস্ফূর্ত সম্মতিক্রমে মহান আল্লাহতালার উদ্দেশ্যে ক্বুরবানী করতে প্রস্তুত ছিলেন। ফলে তারা উভয়ে আনুগত্য ও তাকওয়া পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিলেন। আল্লাহ সুবহানাতায়ালার তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে পুত্র ইসমাঈলের পরিবর্তে একটি জান্নাতি পশু সুন্দর শিং ওয়ালা ক্বুরবানী করান। এরই পথ ধরে উম্মতে মুহাম্মদীর ঈদুল আযহার দিন হালাল পশু ক্বুরবানীর মাধ্যমে নিজেদের সবচাইতে প্রিয়তম জান মাল আল্লাহর প্রতি উৎসর্গ করে সাক্ষ্য বহন করে থাকে।

ক্বুরবানী কাকে বলে?

যুল হিজ্জার ১০, ১১, ১২ ও ১৩ তারিখ আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরয়ী তরিকায় যে পশু যবেহ করা হয় তাকে ক্বুরবানী বলে। ক্বুরবানী ফরজ নয় বরং সক্ষম ব্যক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাত
(বুখারি ৫৫৬৪-৬৫)

ক্বুরবানীর অর্থঃ

আরবী 'ক্বুরবান' শব্দটি ফারসি ও উর্দুতে 'ক্বুরবানী' রূপে পরিচিত হয়েছে যার অর্থ নৈকট্য, আরবী 'করবাতো' শব্দ থেকে উৎপন্ন ও তাই এর অর্থ নিকটবর্তী হওয়া কারো নৈকট্য লাভ করা ইত্যাদি কে বুঝায়। ইসলামীক পরিভাষায় ক্বুরবানী ওই মাধ্যমকে বলা হয় যারা আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নৈকট্য অর্জন ও তার ইবাদতের জন্য পশু যবেহ করা হয়। কোরানে 'ক্বুরবান' শব্দটি মোট তিন জায়গায় দেখতে পাওয়া যায়- সূরা আল ইমরান ৩- ১৮৩, নম্বর আয়াত সূরা মায়েদা ৫ নম্বর সূরা ২৭ নম্বর আয়াত এবং সূরা আহকাফ এর ২৮ নম্বর আয়াত। হাদীসে 'উযহিয়্যাহ' এবং 'যাহিয়্যাহ' শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। এর অর্থ ক্বুরবানীর দিনসমূহে আল্লাহর সান্নিধ্য লাভের উদ্দেশ্যে যবেহ যোগ্য গরু ,ছাগল, ভেড়াকে বলা হয়। এ শব্দটি 'যুহা' শব্দ থেকে গৃহীত যার অর্থ 'পূর্বাহ্ন'। ঈদুল আযহা। মৌলিক কথা হল রাসুল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) নিজেই ঈদের নামকরণ করেছেন 'ইয়াওমুল আযহা'।
(আবু দাউদ মিশকাত হাদীস নাম্বার ১৪৩৯ সিলসিলা সহীহা হাদীস নাম্বার ২০২১ সনদ সহীহ্)।

সর্বপ্রথম ক্বুরবানীর ঘটনাঃ

ক্বুরআন থেকে জানতে পারি। মহান আল্লাহ বলেন,

{وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَاناً فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنْ الآخَرِ قَالَ لأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللهُ مِنْ الْمُتَّقِينَ}

অর্থাৎ, আদমের দুই পুত্রের (হাবিল ও কাবিলের) বৃত্তান্ত তুমি তাদেরকে যথাযথভাবে শুনিয়ে দাও, যখন তারা উভয়ে ক্বুরবানী করেছিল, তখন একজনের ক্বুরবানী কবুল হল এবং অন্য জনের ক্বুরবানী কবুল হল না। তাদের একজন বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। অপরজন বলল, আল্লাহ তো সংযমীদের ক্বুরবানীই কবুল করে থাকেন।
(সূরা মায়েদা-৫:২৭)
পৃথিবীর ইতিহাসে আদম (আঃ) এর পুত্রদ্বয় হাবিল ও কাবিলের ক্বুরবানী প্রথম যাতে হাবিলের ক্বুরবানী কবুল হয় আর কাবিলের ক্বুরবানী প্রত্যাখ্যাত হয়। সে যুগে ক্বুরবানী কবুল হওয়ার নিদর্শন ছিল এই যে আসমান থেকে একটি আগুন এসে ক্বুরবানী নিয়ে অন্তর্হিত হয়ে যেত। যে ক্বুরবানী কে উক্ত অগ্নি গ্রহণ করত না সে ক্বুরবানীকে প্রত্যাখ্যাত মনে করা হতো।

ক্বুরবানীর বিধান প্রত্যেক জাতির জন্যই ছিল

মহান আল্লাহ বলেন,

{وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكاً لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الأَنْعَامِ فَإِلَهُكُمْ إِلَهٌ وَاحِدٌ فَلَهُ أَسْلِمُوا وَبَشِّرْ الْمُخْبِتِينَ - الَّذِينَ إِذَا ذُكِرَ اللهُ وَجِلَتْ قُلُوبُهُمْ وَالصَّابِرِينَ عَلَى مَا أَصَابَهُمْ وَالْمُقِيمِ الصَّلاةِ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنْفِقُونَ}

অর্থাৎ, আমি প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য ক্বুরবানীর বিধান দিয়েছি; যাতে আমি তাদেরকে জীবনোপকরণ সবরূপ যে সব চতুষ্পদ জন্তু দিয়েছি সেগুলির উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে। তোমাদের উপাস্য একমাত্র উপাস্য। সুতরাং তোমরা তাঁরই নিকট আত্মসমর্পণ কর। আর সুসংবাদ দাও বিনীতগণকে; যাদের হৃদয় ভয়ে কম্পিত হয় আল্লাহর নাম স্মরণ করা হলে, যারা তাদের বিপদ-আপদে ধৈর্যধারণ করে, স্বলাত (নামায) কায়েম করে এবং আমি তাদেরকে যে রুযী দিয়েছি তা হতে ব্যয় করে।
(সূরা হাজ্জ ২২:৩৪-৩৫)
আমরা দেখতে পাচ্ছি ক্বুরবানীর ইতিহাস ততটা প্রাচীন যতটা প্রাচীন দিন ধর্ম অথবা মানব জাতির ইতিহাস মানব জাতির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে যত শরীয়ত নাজিল হয়েছে প্রত্যেক শরীয়াতের মধ্যে ক্বুরবানীর বিধান জারি ছিল তবে ওইসব
ক্বুরবানীর কোন বর্ণনা কোন গ্রন্থে পাওয়া যায় না।


বর্তমানে ক্বুরবানীর ইতিহাস

বর্তমানে আমরা যে ক্বুরবানীর সাথে পরিচিত ইব্রাহীম (আঃ) আদর্শ হিসাবে অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় তিনি ছিলেন তৌহিদ এর পূর্ণ অনুসারী। আল্লাহ সুবহানাতায়ালা তাকে অনেক পরীক্ষায় ফেলেছিলেন তার মধ্যে অন্যতম হলো তার কলিজার টুকরো ইসমাঈল (আঃ) কে ক্বুরবানী করা পবিত্র ক্বুরআনে বর্ণিত হয়েছে।

{فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانظُرْ مَاذَا تَرَى قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِن شَاء اللهُ مِنَ الصَّابِرِينَ- فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ- وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ- قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ- إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاء الْمُبِينُ- وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ - وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ}

অর্থাৎ, অতঃপর সে (ইসমাঈল) যখন পিতা (ইব্রাহীমের)র সাথে চলা-ফিরার (কাজ করার) বয়সে উপনীত হল, তখন ইব্রাহীম তাকে বলল, ‘হে বৎস! আমি স্বপ্নে দেখি যে, তোমাকে যবেহ করছি; এখন তোমার অভিমত কি দেখ।’ সে বলল, ‘আববা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তা পালন করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলরূপে পাবেন।’ অনন্তর পিতা-পুত্র উভয়েই যখন আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইব্রাহীম তাকে যবেহ করার জন্য অধোমুখে শায়িত করল, তখন আমি ডেকে বললাম, ‘হে ইব্রাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে দেখালে। আমি এভাবেই সৎকর্মীদেরকে প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয় এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আর আমি তার পরিবর্তে যবেহ করার জন্য এক মহান জন্তু দিয়ে তাকে মুক্ত করে নিলাম। আর তার জন্য এ বিষয়টি পরবর্তীদের জন্য স্মরণীয় করে রাখলাম।
(সুরা সাফফাত ৩৭:১০০-১০৮)
আল্লামা ইবনে কাসীর (৭০১-৭৭৪ হিঃ) বলেন আল্লাহ্ তায়ালা আমাদের জানান যে তার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইব্রাহীম (আঃ) যখন তার পিতৃভূমি থেকে হিজরত করলেন তখন তিনি তার প্রভুর কাছে চেয়ে ছিলেন যে তিনি যেন তাকে একটি সৎকর্মশীল পুত্র দান করেন। তাই আল্লাহ্ তাআলা তাকে একজন ধৈর্যশীল পুত্র সন্তানের সংবাদ দিয়েছিলেন। এটা ছিল ইসমাঈল (আঃ) এর ব্যাপারে, কেননা তিনি ইব্রাহীম (আঃ) এর ঔরসে জন্ম নেওয়া প্রথম সন্তান। এ ব্যাপারে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে কোন মতভেদ নেই যে, ইব্রাহীম (আঃ) এর ঘরে ইসমাঈল (আঃ) ই প্রথম জন্মগ্রহণ করেছিলেন। (হাফেজ ইবনে কাসীর আল বিদায়া ওয়ান নিহায়াহ ১/১৫৭-১৫৮ পৃঃ)
فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ
অতঃপর যখন সে তার সাথে হাঁটার মতো বয়সে উপনীত হলো এর অর্থ হচ্ছে যখন সে বড় হয়েছিল এবং তার বাবার মতোই নিজেই নিজের দেখাশোনা করতে পারত। মুজাহিদ (রহঃ) বলেন, যখন সে তার সাথে হাঁটার মতো বয়সে উপনীত হলো এর অর্থ হচ্ছে যখন সে বড় হয়ে উঠেছিল এবং বাহনে করতে পারত হাঁটতে পারত এবং তার বাবার মত কাজ করতে পারত। ফার্রা বলেন, জবেহের সময় ইসমাঈলের বয়স ছিল ১৩ বছর। ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেন, ওই সময় তিনি কেবল সব লাভ কত্বে উপনীত হয়েছিলেন (তাফসীরে কুরতুবী ১৫ /৯৯ পৃষ্ঠা)। এরকম একটা অবস্থা যখন আসলো তখন ইব্রাহীম (আঃ) স্বপ্নে দেখলেন যে পাপাই তার ছেলেকে ক্বুরবানী করার আদেশ দেওয়া হচ্ছে 'নবীদের স্বপ্ন হচ্ছে ওহী' (মুসনাদে আহমদ, তাফসীর ইবনে কাসীর ১৬ নম্বর খন্ড ২১১ নাম্বার পৃষ্ঠা) । তাদের চক্ষু বন্ধ থাকলেও অন্তর চক্ষু খোলা থাকে। ইব্রাহীম একই স্বপ্ন পরপর তিনরাত্রি দেখেন। প্রথম রাতে তিনি স্বপ্ন দেখে ঘুম থেকে উঠে ভাবতে থাকেন কি করবেন এইজন্য প্রথম রাত কে (৮ যিলহজ্জ) 'ইয়াওমুত তারাবিয়াহ 'বা স্বপ্ন দেখানোর দিন বলা হয়। দ্বিতীয় রাতে আবার একই স্বপ্ন দেখার পর তিনি নিশ্চিত ভাবে বুঝতে পারেন যে এটা আল্লাহর পক্ষ হতে নির্দেশ হয়েছে। এজন্য এই দিনটি (৯ জিল হাজ্জ) ইয়াওমুল আরাফা বা নিশ্চিত হওয়ার দিন বলা হয়। তৃতীয় দিনে পুনরায় একই স্বপ্ন দেখায় তিনি ছেলেকে ক্বুরবানী করার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন। এর জন্য এই দিনটিকে 10 এই জিলহাজ ইয়াওমুন নাহর বা ক্বুরবানীর দিন বলা হয় (তাফসীরে কুরতুবী ১৫ /১০২ পৃষ্ঠা)।
স্বপ্নকে বাস্তব করার জন্য ইব্রাহীম (আঃ) নিজের পুত্রকে আল্লাহর রাহে ক্বুরবানী করার জন্য তৈরি হলেন এবং সেও বিবি হাজেরাকে বললেন একে মুখ হাত ধুয়ে কাপড় পরিয়ে দাও ওকে একটা কাজে নিয়ে যাব অতঃপর পিতা-পুত্র যখন ঘর থেকে বের হলেন তখন শয়তান বিবি হাজেরার নিকটে গিয়ে হাজির হলো এবং তাকে বলল তোমার ছেলে কে ইব্রাহিম কোথায় নিয়ে গেলেন! তিনি বললেন কোন কাজে নিয়ে গেছেন। অতঃপর শয়তান বলল না, না তিনি তাকে কোন কাজে নিয়ে যায়নি বরং তাকে যবেহ করতে নিয়ে গেছেন। হাজেরা বললেন তিনি তাকে যাবে করবেন কেন শয়তান বলল ইব্রাহীম কে তার প্রভু নাকি এই কাজের হুকুম দিয়েছেন। এ কথা শোনে হাজিরা দিলেন তাহলে তো তিনি তার তার পরওয়ারদেগারের হুকুম পালন করে খুব ভালো কাজ করেছেন। এখানে শয়তান নিরাশ হয়ে তাদের দুজনের পিছনে ছোটলো।

● তারপর ইসমাঈলকে গিয়ে বলল তোমার পিতা তোমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন সে বলল কোন কাজে শয়তান বলল না কোন কাজে নয় বরং তোমাকে জবেহ করতে নিয়ে যাচ্ছেন সে বলল আমাকে তিনি যবেহ করবেন কেন শয়তান বলল তোমাকে যবে করতে নাকি আল্লাহ তাকে আদেশ করেছেন তখন ইসমাঈল বলল আল্লাহর কসম যদি সত্যি আল্লাহ আমাকে জবেহ করতে নির্দেশ দিয়ে থাকেন তবে তা তাড়াতাড়ি তারে কাজ করা উচিত! শয়তান এখানে নিরাশ হয়ে ইব্রাহীম এর নিকট গিয়ে বলল ছেলেকে নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন উত্তরে তিনি বললেন প্রয়োজনীয় কাজে যাচ্ছি শয়তান বলল আপনি তো তাকে কোন প্রয়োজন এ নিয়ে যাচ্ছেন না ওকে যবেহ করার জন্য নিয়ে যাচ্ছেন ইব্রাহীম বললেন আমি কেন একে যবেহ করব? শয়তান জবাব দিলো হয়তো আপনার প্রতিপালক আপনাকে এ কাজের আদেশ করেছেন। তিনি তখন বললেন আমার প্রতিপালক যদি আমাকে আদেশ করি থাকেন তবে আমি তা করবো (তাফসীর ইবনে কাসীর ১৬ নাম্বার খণ্ড ২১৩ থেকে ২১৪ নাম্বার পৃষ্ঠা)।

● শয়তান তিনবার যথাক্রমে বিবি হাজেরা ইসমাঈল ও ইব্রাহিম (আঃ)কে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু প্রতিবারই উক্ত তিনজনের কাছে মার খেয়ে নিরাশ হয়ে যায় তাই তাদের স্মৃতি আজও প্রতি বছর হজ পালন করা হয়।

● অতঃপর তিনি তাঁর পুত্রকে বললেন হে পুত্র আমি স্বপ্ন দেখেছি যে তোমাকে আমি যবেহ করছি। অতএব এ ব্যাপারে তোমার মতামত কি? সে বলল আপনি তাই করুন আপনাকে যা হুকুম দেয়া হয়েছে এ ব্যাপারে যদি আল্লাহ চান তো আপনি আমাকে ধৈর্যশীল পাবেন (সুরা সাফফাত ৩৭ নম্বর সূরা ১০২ নাম্বার আয়াত)।

● অতঃপর আল্লাহ বলেন তখন আমি আহবান করে বললাম হে ইব্রাহীম তুমিতো স্বপ্নাদেশ সত্যি পালন করলে এভাবে আমি সৎকর্মশীলদেরকে পুরস্কৃত করে থাকি। নিশ্চয়ই এটা ছিল একটি স্পষ্ট পরীক্ষা। আমি তাকে ইসমাঈলকে মুক্ত করলাম এক মহান জান্নাতের প্রেরিত দুম্বার ক্বুরবানীর বিনিময়ে (সুরা সাফফাত ৩৭ নম্বর সূরা ১০৪-১০৭ নম্বর আয়াত)।

● আর ওই ঐতিহাসিক ক্বুরবানীর ঘটনাটি ঘটেছিল আজ থেকে ৫৩১২ বছর আগে অর্থাৎ বর্তমান হিজরী সন ১৪৪০ তে ইব্রাহীম (আঃ) এর ঘটনাটি হবে ৫৩২০ তম ক্বুরবানীর দিবস (এই হিসেবটা ইমামুল হিন্দ মাওলানা আবুল কালাম আজাদ এর হিসাব অনুসারে লেখা হয়েছে তার 'ঈদায়ন পুস্তকে' পুস্তকের ২২ নাম্বার পৃষ্ঠা)।

●উক্ত ক্বুরবানীর ঘটনা নিজের পুত্রকে আল্লাহর রাহে ক্বুরবানীর করার জন্য ইব্রাহীম এর ওই সুন্নাতটি উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য আল্লাহ স্মরণীয় করে রেখে দিলেন আল্লাহ বলেন এবং পরবর্তীতে এর মধ্যে তার ইব্রাহীম ও ইসমাঈলের স্মৃতিকে আমি ছেড়ে রাখলাম (সুরা সাফফাত ১০৮ নম্বর আয়াত )।

● আল্লাহর ঘোষণা অনুযায়ী তখন হতে চলে আসছে এই ইব্রাহীম আদর্শের বাস্তবায়ন তাই বিশ্ব মুসলিম আল্লাহর হুকুম পালনের সাথে সাথে প্রতি বছর ইব্রাহীম স্মৃতি স্মরণ করে ১০ তারিখে বিশ্বব্যাপী শরীয়াত নির্ধারিত পশু ক্বুরবানী করে থাকে।

● ক্বুরবানীর উদ্দেশ্য, লক্ষণীয় বিষয়ঃ
উপরের আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারি ইব্রাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) এর ক্বুরবানীর ঘটনা থেকে এটা প্রমাণ হলো যে ক্বুরবানী কেবলমাত্র পশু বলিদান নয় বরং পশু ক্বুরবানীর মাধ্যমে মানুষের অন্তরে তাকওয়া ও পরহেজগারী মহান আল্লাহ দেখতে চান। যেমন আল্লাহ  সূরা আল-হাজ্ব (২২ঃ৩৭) বলেনঃ
لَن يَنَالَ ٱللَّهَ لُحُومُهَا وَلَا دِمَآؤُهَا وَلَٰكِن يَنَالُهُ ٱلتَّقْوَىٰ مِنكُمْ كَذَٰلِكَ سَخَّرَهَا لَكُمْ لِتُكَبِّرُوا۟ ٱللَّهَ عَلَىٰ مَا هَدَىٰكُمْ وَبَشِّرِ ٱلْمُحْسِنِينَ
এগুলোর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছে না, কিন্তু পৌঁছে তাঁর কাছে তোমাদের মনের তাকওয়া। এমনিভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের বশ করে দিয়েছেন, যাতে তোমরা আল্লাহর মহত্ত্ব ঘোষণা কর এ কারণে যে, তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন। সুতরাং সৎকর্মশীলদের সুসংবাদ শুনিয়ে দিন।
অর্থাৎঃ ক্বুরবানীর গোশত রক্ত আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না।আল্লাহর নিকট পৌঁছায় মানুষের অন্তরে আল্লাহ ভীতি ও তাকওয়া। কাজে মুসলমান ভাইরা ক্বুরবানী করবেন তারা যেন আল্লাহর রাহে একমাত্র আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য যেন ওটা হয়। তাছাড়া যদি কোন ব্যক্তির মধ্যে লোক দেখানো ভাব থাকে বা সে যদি মনে করে ওমুক এত হাজার টাকায় ক্বুরবানী পশু কিনেছে, আমি তার থেকে দামী কিনব বা তার থেকে বড় কিনব যাতে করে লোক আমার নাম করে এবং বলে বেড়ায় এত হাজার টাকার বা এত বড় গরু কিনেছে যদি ধারণা এরকমই হয় তাহলে জেনে রাখুন আপনার ক্বুরবানী করা শুধু আত্মীয় স্বজনদের ও পাড়া প্রতিবেশীদের এবং নিজের গোশত খাওয়া ছাড়া কিছুই হবে না। বরং ওটা শির্ক পর্যায়ে চলে যেতে পারে।
আবার দেখা যায় যে, কিছু মানুষ মান সম্মানের জন্য ক্বুরবানী করে। এমন কিছু লোক আছে যাদের এক সময় হয়তো ধনসম্পত্তি আধিক্য ছিল নাম ছিল, খ্যাতি ছিল, সে সময় তারা হয়তো নামী-দামী গরু ক্বুরবানী করতো কিন্তু বর্তমানে সে ভিখারী তার সেরকম আর কিছুই নেই আর্থিক অবস্থা খুবই খারাপ তবুও সমাজে লোক-লজ্জায় ধার দেনা করে ভালো ভালো ক্বুরবানী করে থাকে, মূলত তার ক্বুরবানী আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য হলো না তাকওয়া আল্লাহ ভীরুতা প্রচ্ছন্ন হয়ে পরলো। এরকম ক্বুরবানী আল্লাহ তার ক্বুরবানী কবুল করবেন না ।তাই আমাদেরকে বা যাদের মনে এরকম মনোভাব আছে তাদেরকে এরকম মনোভাব থেকে ত্যাগ করে শুধুমাত্র আল্লাহর উদ্দেশ্যেই ক্বুরবানী করতে হবে আল্লাহ যেন আমাদেরকে তৌফিক দান করেন আমীন।

● ক্বুরবানীর উদ্দেশ্য হবে শর্তহীন আনুগত্য। আল্লাহ তার বান্দাকে যে কোন আদেশ দেওয়ার অধিকার রাখে এবং বান্দা তা পালন করতে বাধ্য। আল্লাহর আদেশ সহজ হোক আর কঠিনই বা হোক তা পালন করার বিষয়ে একই মন মানসিকতা থাকতে এবং আল্লাহর হুকুম মানার বিষয়ে মায়া মমতা প্রতিবন্ধকতা হতে পারে ।ইব্রাহীম (আঃ) এর অনুগত্য ছিল শর্তহীন আনুগত্য।

● ক্বুরবানীর উদ্দেশ্য হবে প্রত্যেক ইবাদত আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব তার প্রমান বহন করে তাই ক্বুরবানীর মাধ্যমে আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করা। যেমন আল্লাহ সুবহানাতালা বলেন সূরা হাজ্জ ৩৭ নম্বর আয়াত এভাবে তিনি এগুলোকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তোমরা আল্লাহর শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা করো এজন্য যে তিনি তোমাদের পথ প্রদর্শন করেছেন সুতরাং আপনি সুসংবাদ দিন সৎকর্মপরায়ণদেরকে।

● ক্বুরবানীর উদ্দেশ্য ত্যাগ করার মহান পরীক্ষা। ক্বুরবানীর অন্যতম উদ্দেশ্য হল ত্যাগ করার মানসিকতা তৈরি করা। আল্লাহর বিধান পালনে জানমালের ত্যাগ স্বীকার করতে হবে। ক্বুরবানী ঈদকে মাংস খাবার অনুষ্ঠানে পরিণত করা নয় বরং নিজেদের মাঝে পশুসুলভ আচরণ ত্যাগ করার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। নাফসের আনুগত্য ত্যাগ করে আল্লাহর একান্ত অনুগত হওয়া ক্বুরবানীর আসল উদ্দেশ্য।
উপসংহারে বলতে চাই যে ,একমাত্র আল্লাহ সুবহানাতালা নৈকট্য লাভের জন্য এক মহান বাবা তার প্রাণের অধিক ভালোবাসার পাত্র কে অর্থাৎ পুত্রকে ক্বুরবানীর করার জন্য যে ধৈর্যশীলতার উত্তম নমুনা ও কঠিনতম পরীক্ষায় সাফল্যজনকভাবে সফল হয়েছে সে ইতিহাস দেখতে পাই! পৃথিবীতে যা বিরল। ইব্রাহীম ও ইসমাঈল (আঃ) আত্মত্যাগ এবং আল্লাহর প্রতি সীমাহীন আনুগত্যের সাবলীল বহিঃ প্রকাশ থেকে শিক্ষা নিয়ে আমাদেরকে আল্লাহ মুখি হওয়া ও নাফসের গোলামী কে ক্বুরবানী করার চেষ্টা করা। আল্লাহ যেন-
আমাদেরকে সেই তৌফিক প্রদান করুক আমীন।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url