sahri & iftar time

হিজাবের আড়ালে

 

লেখক: আলমগীর সরদার

কিছুদিন ধরে দেশের মধ্যে বহুল চর্চিত বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে হিজাব। দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতেও বিষয়টি সমানভাবে চর্চিত হচ্ছে। মন্তব্য আসছে নানা রূপ। পক্ষে বিপক্ষে উভয় মতামতই প্রতিফলিত হচ্ছে সব রকমের মিডিয়ায়। এ নিয়ে হিংসা বিদ্বেষ ছড়িয়ে পড়ছে দেশের দিগ্বিদিক। 


   হঠাৎ কি এমন হলো যে, হিজাবের মধ্যে গোটা দেশ মাথা ঢুকিয়ে দিল! ঘটনাটি কর্নাটকের একটি কলেজে কিছু ছাত্রী হিজাব পরিহিত অবস্থায় তাদের প্রবেশে বাধাদান। আর সে বাধাদানকে কেন্দ্র করে যত বিপত্তি! আর সে বিপত্তি থেকেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হিজাব।


    হিজাব আসলে কি? হিজাব হলো- নারীদেহের উপরিভাগ সহ মুখমণ্ডল ঢাকার একটুকরো কাপড়। কিন্তু সে কাপড় আজ শুধুমাত্র একটুকরো কাপড়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সে কাপড় আজ বহু রাজনৈতিক দলের শামিয়ানা। হিজাবের ছোট্ট একটুকরো কাপড়ের কি যে অপার মহিমা! কি যে তার অসীম কৃপা! তাবড় তাবড় রাজনৈতিক দল সহ কিছু ধর্মোন্মাদদের আশ্রয় স্থল ও রুটি রোজগারের হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে এই হিজাব। যারা তপ্ত রুদ্র ভোট ময়দানে অসহনীয় পিপাসিত হয়ে পড়েছিলেন, তিষ্ঠাতে যাদের জীবন ওষ্ঠাগত হয়ে উঠেছিল, তাদের প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল একটু শামিয়ানার। তাই তারা নিজ স্বার্থ সিদ্ধির আড়ালে হিজাবের চাঁদোয়ায় আশ্রিত হলেন। তাই বলা চলে হিজাব এই মুহূর্তে শুধুমাত্র মুসলিম মেয়েদের মাথার উপরিভাগ নয়, দেশের একশ্রেণীর মানুষের করে কেম্মে খাবার আচ্ছাদনও বটে। 


 

 আচ্ছা মুসলিম মেয়েরা হিজাব পরিহিত অবস্থায় স্কুল-কলেজে গেলে অসুবিধা কোথায়? এ বিষয়ে দুটি মতের প্রতিফলন দেখতে পাই। বিপক্ষীয় মতের যুক্তি; স্কুল-কলেজে ড্রেসকোড মেনে চলা উচিত। তাছাড়া হিজাব নাকি প্রগতির অন্তরায়! এছাড়াও কিছু খোঁড়া ও অন্ধ যুক্তি তাদের আছে। যা অন্ধরা ছাড়া আর কেউ-ই বুঝবে না। আর যারা হিজাবের পক্ষে তাদের যুক্তি মুসলিম মহিলাদের ধর্মাচারণ সহ নারীদের পোশাকের স্বাধীনতা ও শালীনতা থাকা উচিত। 


আচ্ছা, নারীদেহ ঢেকে রাখা কি প্রগতির অন্তরায়? যদি অন্তরায় হয় তাহলে উলঙ্গ  থাকাটাই তো সবচেয়ে বেশি প্রগতি। তাই নয় কি? সেজন্য কি স্কুল-কলেজ সহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনে এক শ্রেণীর নারীরা স্কিনফিট পোশাকসহ বক্ষ বিভাজিকা ও স্লিভলেস দেখানোর প্রতিযোগীতায় মত্ত? নারীদেহের আকর্ষণীয় অঙ্গ দেখানোটা যদি তাদের স্বাধীনতা হয়, তাহলে একজন নারীর আব্রু রক্ষার্থে মুখমন্ডল ঢাকার স্বাধীনতা থাকবেনা কেন? মনে রাখা প্রয়োজন- অঙ্গ ঢাকার জন্যই পোশাক। কতটা ঢাকতে হবে সেটা তার রুচির ব্যাপার। বিশেষত তুলনামূলকভাবে নারীর পোশাক বেশি হওয়াই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় অধুনা সংস্কৃতিতে নারীর পোশাকের চেয়ে ঢের বেশী পোশাক পরিধান করে পুরুষরা। যে নারীর পোশাক যত ছোট, সে ততই বাহবা পায়। আবার যে নারী যত বেশি উলঙ্গ, পেপার পত্রিকায় তার জয়গাথা ভরপুর। তাহলে উলঙ্গ হওয়াটাই কি সভ্যতা? আর আমরা কি এই সভ্যতার অংশ?


 মুসলিম নারীদের স্কুলে যদি পোশাকের স্বাধীনতা না থাকে, আর সেটা যদি ধর্মচারণ হয়! তাহলে স্কুল-কলেজে জয় শ্রীরাম, সরস্বতী পূজা, পূজা উপলক্ষে মুসলিমদের থেকে সুকৌশলে চাঁদা আদায়, বিবাহিত নারীর শাঁখা-সিঁদুর, কারও বা মাথায় টিকি-পাগড়ী  কালীপূজা, গনেশ পূজা, বিশ্বকর্মা পূজা এগুলি ধর্মচারণ নয় কি? 


    আসলে বিষয়টি যতটুকু না ধর্মের তারচেয়ে শতগুণে রাজনীতির। বিশেষত মুসলিমরা আজ রাজনীতির খোরাক হয়ে পড়েছে। কখনো তালাক, কখনো বাবরি, কখনো বা মথুরা কাশি, আবার কখনো বা নানান জুজু। যা হয়তো এমনিভাবে চলতেই থাকবে। উন্নতি বাদ দিয়ে যারা ধর্ম উন্মাদনায় দেশবাসীকে মত্ত রাখতে চায়, আর যাই হোক তারা ধর্মের নামে বকধার্মিক ছাড়া আর কিছুই নয়। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য রাজ্যে যাঁরা ভোটের জন্য হিজাব পরিধান করতো, তাঁরাও আজ হিজাব বিষয়ে নির্বিকার। আসলে কি আর বলবো-

  একবার এক রাজনৈতিক দলের আইটি সেলের অধিকর্তার সাথে আমার কিছু কথোপকথন হয়। সেদিন তাঁকে বলেছিলাম,  আগামী দিনে আপনারা আর কোন মুখে ভোট চাইতে যাবেন। কারণ, সফলতার চাইতে বিফলতাই আপনাদের সমধিক। আপনাদের হাতে আর তো কোনও ইস্যু নেই, যা নিয়ে ভোট চাইতে পারবেন। তিনি সেদিন ক্রূর হাসি হেসে বলেছিলেন, আপনি আসলে রাজনৈতিক অঙ্গনে একজন বোকা! কারণ, ভোট বৈতরণী পার হতে ইস্যু না থাকলে ইস্যু তৈরি করে নিতে হয়। সেদিন তার কথায় ব্যঙ্গাত্মকভাবে আমি হেসেছিলাম। আজ আবারও হাসছি, তবে ব্যঙ্গাত্মকভাবে নয়, সেদিনের সে কথার বাস্তব প্রতিফলনে।

Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url