তাওহীদ ও শির্ক
তাওহীদ এর সংজ্ঞা
তাওহীদ শব্দটি (وحد) ক্রিয়ামূল থেকে উৎপত্তি হয়েছে। এর আভিধানিক অর্থ কোনো জিনিসকে একক হিসেবে নির্ধারণ করা। 'না' বাচক ও 'হ্যাঁ' বাচক উক্তি ব্যতীত এটির বাস্তবায়ন হওয়া সম্ভব নয়। অর্থাৎ একককৃত বস্তু ব্যতীত অন্য বস্তু হতে কোনো বিধানকে অস্বীকার করে একককৃত বস্তুর জন্য তা সাব্যস্ত করা। উদাহরণস্বরূপ আমরা বলবো, "আল্লাহ ছাড়া সত্য কোনো মা'বূদ নেই” এ বাক্যের মাধ্যমে সাক্ষ্য দেওয়া ছাড়া কোনো ব্যক্তির তাওহীদ পূর্ণ হবে না।
তাওহীদ কয় প্রকার ও কি কি?
তাওহীদ ৩ প্রকার যথা--
১. তাওহীদুর রুবূবীয়্যাহ
২. তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ
৩. তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত
তাওহীদে রুবূবীয়্যার
রাজত্ব, কর্তৃত্ব সৃষ্টি ও পরিচালনার ক্ষেত্রে আল্লাহকে এক হিসাবে বিশ্বাস করার নাম তাওহীদে রুবূবীয়্যাহ।
তাওহীদুল উলুহিয়্যাহ
এককভাবে আল্লাহর ইবাদাত করার নাম তাওহীদে উলুহিয়্যাহ। মানুষ যেভাবে আল্লাহর ইবাদাত করে এবং নৈকট্য হাসিলের চেষ্টা করে, অনুরূপ অন্য কাউকে ইবাদাতের জন্য গ্রহণ না করা।
তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাত
তাওহীদুল আসমা ওয়াস সিফাতের অর্থ হলো, আল্লাহ নিজেকে যে সমস্ত নামে নামকরণ করেছেন এবং তাঁর কিতাবে নিজেকে যে সমস্ত গুণে গুণান্বিত করেছেন সে সমস্ত নাম ও গুণাবলীতে আল্লাহকে একক ও অদ্বিতীয় হিসেবে মেনে নেওয়া।
শিরক কাকে বলে?
শিরক শব্দটি ইসলামে একটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। শিরক বলতে আল্লাহর সাথে কাউকে বা কোনো কিছুকে অংশীদার বানানো বোঝায়। অর্থাৎ, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে ইবাদত, দোয়া, সাহায্য বা উপাসনা করা শিরক হিসেবে গণ্য হয়। কুরআনুল কারীমে শিরককে সবচেয়ে বড় গুনাহ বলা হয়েছে।
শিরক শব্দের অর্থ কি?
“শিরক” শব্দটি আরবি ভাষার شرك (শারাকা) থেকে এসেছে, যার অর্থ হলো অংশীদার করা, শরীক বানানো। ইসলামী পরিভাষায়, আল্লাহর একত্বে (তাওহীদে) কাউকে শরীক করা বা তাঁর গুণাবলীতে অন্যকে অংশীদার করা শিরক।
শিরক কত প্রকার ও কী কী
ইসলামী আলেমদের মতে শিরক প্রধানত তিন প্রকারঃ1. শির্ক ফি-রুবুবিয়্যাহ (প্রভুত্বে শরীক করা) যেমন: বিশ্বাস করা যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কেউ সৃষ্টি করে, রিযিক দেয়, জীবন-মৃত্যু নির্ধারণ করে।
2. শির্ক ফি-উলুহিয়্যাহ (ইবাদতে শরীক করা) যেমন: আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও জন্য নামাজ, দোয়া, কোরবানি, মানত করা।
3. শির্ক ফি-আস্মা ওয়া সিফাত (আল্লাহর নাম ও গুণে শরীক করা) যেমন: আল্লাহর বিশেষ গুণাবলী অন্য কারও মধ্যে আছে মনে করা (যেমন— সবকিছু জানা, সর্বশক্তিমান, সর্বত্র উপস্থিত থাকা ইত্যাদি)।
এছাড়া বিস্তারিতভাবে শিরককে ভাগ করা হয়ঃ
সবচেয়ে বড় শিরক কোনটি?
সবচেয়ে বড় শিরক হলো শিরকুল আকবর। যেমনঃকুরআনে আল্লাহ বলেছেন:
“আল্লাহ নিশ্চয়ই শিরক ক্ষমা করবেন না। তিনি ইচ্ছা করলে এর বাইরে যাকে খুশি ক্ষমা করবেন।” (সূরা নিসা: ৪৮)
ছোট শিরক কী?
ছোট শিরক (শিরকুল আসগর) হলো এমন কিছু কাজ, যা সরাসরি আল্লাহর সাথে অংশীদার করা না হলেও তাওহীদের পরিপন্থী। উদাহরণঃ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“তোমাদের জন্য সবচেয়ে ভয় করি সেই শিরক, যা অতি ক্ষুদ্র।” সাহাবারা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে রাসূলুল্লাহ! সেটা কী?’ তিনি বললেন, “রিয়া (দেখানো)।” (ইবন মাজাহ)
কোন কোন কারণে শিরক হয়?
মানুষ বিভিন্ন কারণে শিরকে লিপ্ত হয়ঃ
1.অজ্ঞতা – তাওহীদের সঠিক জ্ঞান না থাকা
2. অন্ধ অনুকরণ – পূর্বপুরুষের ভুল বিশ্বাস অন্ধভাবে অনুসরণ করা
3. লোভ ও ভয় – দুনিয়াবি স্বার্থে মিথ্যা দেব-দেবীর কাছে প্রার্থনা করা
4. অতিরিক্ত ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা – কোনো মানুষ বা পীর-মুর্শিদকে অতিরঞ্জিত মর্যাদা দেওয়া
5. কুসংস্কার ও অযৌক্তিক বিশ্বাস – জ্যোতিষী, তাবিজ, গণক প্রভৃতির ওপর নির্ভর করা
✦
উপসংহার:
শিরক হলো ইসলামের সবচেয়ে ভয়াবহ গুনাহ, যা মানুষকে ইসলাম থেকে বের করে দেয়। তাই মুসলমানদের উচিত আল্লাহর একত্বে দৃঢ় বিশ্বাস রাখা এবং সব ধরণের শিরক থেকে বেঁচে থাকা।
