sahri & iftar time

বিবাহ কাকে বলে ? বিবাহের গুরুত্ব । বিবাহ না করা।


Marriage


বিবাহঃ

বিবাহ হল একটি অনুষ্ঠান। সামাজিক ও ধর্মীয় নীতি এটিকে একটি অনুষ্ঠান হিসাবে পরিপূর্ণতা দিয়েছে। বিভিন্ন ধর্ম মতে বিবাহ একটি সুখের বন্ধন এবং তাদের ভিন্নতাও দেখতে পাওয়া যায়। হিন্দু ধর্ম মতে বিবাহ জন্ম-জন্মান্তরের অর্থাৎ 'সাত' জন্মের। কিন্তু ইসলাম ধর্মে বিবাহ হল একটি (Contract) চুক্তি।

ইসলাম ধর্মে বিবাহ একটি আইনগত, সামাজিক এবং ধর্মীয় বিধান। ইসলামে বিবাহ বলতে স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে সামাজিকভাবে স্বীকৃত ও ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত একটি চুক্তি বোঝায়। এই চুক্তির মাধ্যমেই একজন পুরুষ ও একজন নারীর মধ্যে স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ক স্থাপিত হয়ে তাদের দাম্পত্য জীবন শুরু হয়।

প্রত্যেক পুরুষ ও নারী যৌবনে পা দেওয়ার পর তাদের দৈহিক ও মানসিক কারণে এবং আকর্ষনে একে অপরকে সঙ্গী রূপে পেতে চায়। এই চাওয়া পাওয়াটা একটা বিশেষ বন্ধন এর মাধ্যমে হতে হবে, নইলে ধর্ম ও সমাজ তাকে পরিত্যাগ করে দেয় এবং ওই বন্ধন ছাড়া পুরুষ ও নারী যদি মিলন করে তাহলে তাকে শরীয়তের দৃষ্টিকনে ব্যভিচার বলা হয়েছে। যা মারাত্মক পাপ। বিবাহ এমন একটি সামাজিক বন্ধন যা নারী-পুরুষের যৌন ক্ষুধাকে দূরীভূত করে। আর তা যদি সময় মত না দেওয়া হয় তাহলে সমাজে ধর্ষণের মতো ঘটনা প্রচুর পরিমাণে দেখা দিবে, প্রকাশ্যে দিন রাতে এবং সমাজকে তথা সমস্ত মানবজাতিকে কলুষিত করে তুলবে তাতে কোন সন্দেহ নেই। আপনাদের সামনে কিছু এ সম্পর্কে আলোচনা তুলে ধরবো, ইনশাল্লাহ আজিজ।

বিবাহের তাৎপর্যঃ

ইসলামে নারী-পুরুষের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিয়ে হচ্ছে একমাত্র বৈধ উপায়ে। মানুষ বিয়ে করার মাধ্যমে তার চরিত্র তার সতীত্ব কে রক্ষা করতে পারে। মানুষের পোশাক যেমন তার দেহকে ঢেকে রাখে নগ্নতা, কলুষতা, বেহাপনা -এ বিষয়গুলো প্রকাশ হতে দেয় না। বিবাহ তেমনি স্বামী-স্ত্রী জুটি ও যৌন উত্তেজনা ঢেকে রাখে প্রকাশ হতে দেয় না।আল্লাহ বিয়ের মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বন্ধুত্ব প্রেম প্রীতি মায়া মমতা সহানুভূতি সৃষ্টি করে দিয়েছেন।বিয়ের মাধ্যমে স্বামী স্ত্রীর যৌন সম্পর্ক খুবই তৃপ্তি দায়ক হয় ,মুখের গন্ধ হয় খুবই মিষ্টি, দাম্পত্য জীবন সুখের হয় ,বিয়ের মাধ্যমে পরস্পরের উপর অধিকার আরোপিত হয় এবং পরস্পরের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য অবশ্য পালনীয় হয়ে পরে।

আল্লাহ সুবহানাতায়ালা বলেন
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِّن قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوٰجًا وَذُرِّيَّةً ۚ وَمَا كَانَ لِرَسُولٍ أَن يَأْتِىَ بِـَٔايَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللَّهِ ۗ لِكُلِّ أَجَلٍ كِتَابٌ

আর অবশ্যই তোমার পূর্বে আমি রাসূলদের প্রেরণ করেছি এবং তাদেরকে দিয়েছি স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি।
(সূরা রাদ ১৩:৩৮)


লক্ষ্য করুন আল্লাহ বলেন বিয়ের ব্যবস্থাকে নবী ও রাসূলগণের প্রতি দান বলে উল্লেখ করেছেন।

আল্লাহ তা'আলা বলেন --
وَأَنكِحُوا الْأَيٰمٰى مِنكُمْ وَالصّٰلِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَآئِكُمْ ۚ إِن يَكُونُوا فُقَرَآءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِۦ ۗ وَاللَّهُ وٰسِعٌ عَلِيمٌ

আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী।
(সূরা নূর ২৪:৩২ নম্বর আয়াত)

সূরা নিসা ৩২ নম্বর আয়াতে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা বলেন, বিয়ে করে পরিবার দুর্গ রচনা করতে বলেছেন। যেনা, ব্যাভিচার, বন্ধ করার নির্দেশ দিয়েছেন। গোপন বন্ধুত্ব করে ধর্ষণ করার জন্য সমস্ত পথকে বন্ধ করার আদেশ দিয়েছেন, এগুলোর মাধ্যমে অর্জন করা সম্ভব।

'আল্লাহ আরও বলেন স্ত্রীরা হচ্ছে তোমাদের জন্য পোশাক স্বরূপ আর তোমরা তাদের জন্য পোশাক'
إِلٰى نِسَآئِكُمْ ۚ هُنَّ لِبَاسٌ لَّكُمْ وَأَنتُمْ لِبَاسٌ لَّهُنَّ ۗ

তারা তোমাদের জন্য পরিচ্ছদ এবং তোমরা তাদের জন্য পরিচ্ছদ।
(সূরা বাকারা ২:১৮৭)


আমরা প্রমাণ পাচ্ছি যে, পোশাক যেমন মানবদেহে আবৃত করে তার নগ্নতা এবং তার বেহাপনা প্রকাশ হতে দেয় না এবং সর্ব প্রকার ক্ষতি থেকে বাঁচায় স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের জন্য ঠিক তেমনি।
আল্লাহ সুবহানাতালা আরো বলেন,
وَمِنْ ءَايٰتِهِۦٓ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنفُسِكُمْ أَزْوٰجًا لِّتَسْكُنُوٓا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً ۚ إِنَّ فِى ذٰلِكَ لَءَايٰتٍ لِّقَوْمٍ يَتَفَكَّرُونَ

আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের থেকেই স্ত্রীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও। আর তিনি তোমাদের মধ্যে ভালবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এর মধ্যে নিদর্শনাবলী রয়েছে সে কওমের জন্য, যারা চিন্তা করে।
(সূরা রুম ৩০:২১)


এ আয়াতে প্রমাণ হচ্ছে যে নারীকে পুরুষ হতে সৃষ্টি করে বিয়ের ব্যবস্থা করা আল্লাহর নিদর্শন নারী পুরুষের জন্য তৃপ্তি বহাল রাখার জন্য স্বামী স্ত্রীর মাঝে প্রেম ভালোবাসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।

'আল্লাহ সুবহানাতায়ালা বলেন যারা বিবাহ সমর্থ নয় তারা যেন সংযম অবলম্বন করে যে পর্যন্ত না আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেন।
(সূরা নূর ২৪:৩৩)

আবু হুরায়রা (রাযিঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম বলেছেন, যার দ্বীনদারী ও নৈতিক চরিত্র সম্পর্কে আমরা সন্তুষ্ট সে যদি তোমাদের কাছে বিবাহের প্রস্তাব দেয় তাহলে তার বিয়ে করিয়ে দাও তা না হলে জমিনের উপর বিপদ আপদ ও ফিতনা-ফাসাদ ঘটবার সম্ভাবনা বেশি।
(মিশকাত-৩০৯০)

এই হাদিস থেকে আমার জানতে পারছি, বিবাহ করার গুরুত্ব সম্পর্কে যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ বিবাহ করা মুসলমানদের একান্ত কর্তব্য আর কোন ব্যক্তি যদি বিবাহ করার সামর্থ্য না থাকে তো তাহলে সে যেন রোজা রাখে তারা রোজা রাখলে মানুষের শরীরের মধ্যে যৌন চাহিদা কমে যায়।


বিবাহ না করার মারাত্বক সিদ্ধান্তঃ

আল্লাহ সুবাহানাতালা বলেন--
وَأَنكِحُوا الْأَيٰمٰى مِنكُمْ وَالصّٰلِحِينَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَآئِكُمْ ۚ إِن يَكُونُوا فُقَرَآءَ يُغْنِهِمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِۦ ۗ وَاللَّهُ وٰسِعٌ عَلِيمٌ
আর তোমরা তোমাদের মধ্যকার অবিবাহিত নারী-পুরুষ ও সৎকর্মশীল দাস দাসীদের বিবাহ দাও। তারা অভাবী হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দেবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময় ও মহাজ্ঞানী।
(সূরা নূর ২৪:৩২)

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:

সব ইবনে আবী ওয়াক্কাস( রাযি:) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন,নাবী( সাঃ:) উসমান ইবনে মাসউদকে বিয়ে করা থেকে বিরত থাকতে নিষেধ করেছেন।নাবী( সাঃ) তাকে যদি অনুমতি দিতেন, তাহলে আমরাও খাসি হয়ে যেতাম।
(বুখারী-৫০৭৩, মুসলিম-১৪৮২)


নবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বিবাহ ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন।
(তিরমিজি-১০৮২)


আনাস ইবনে মালেক রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, তিন জনের একটি দল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু সাল্লামের ইবাদত করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য নবী করীম সাল্লাল্লাহু সাল্লাম এর স্ত্রীদের বাড়িতে আসলো। যখন তাদেরকে এ সম্পর্কে জানানো হয় তখন তারা ইবাদতের পরিমাণ কম মনে করল এবং বলল নবী সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম এর সঙ্গে আমাদের তুলনা হতে পারে না, কারণ তার আগের ও পরের গুনাহ ক্ষমা করা হয়েছে, এ সময় তাদের মধ্যে থেকে একজন বলল, আমি সারা জীবন রাতভর নামায আদায় করব, একজন বলল আমি সব সময় রোজা পালন করব এবং কখনো তা ছাড়ব না, অপরজন বললাম আমি নারী সংস্পর্শ করবো না, কখনো বিয়ে করব না। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম নিকট এলেন এবং বললেন তোমরা কি ওই সব লোক যারা এমন এমন কথা বার্তা বোলছো? আল্লাহর কসম আমি আল্লাহকে তোমাদের চাইতে বেশি ভয় করি এবং তোমাদের চেয়ে বেশি বেশি অনুগত। আমি রোজা পালন করি, আর তা থেকে বিরত থাকি, নামাজ আদায় করি, মেয়েদের বিবাহ করি, সুতরাং যারা আমার সুন্নতের প্রতি বিরূপ পোষণ করবে, তারা আমার দলভুক্ত নয় অর্থাৎ মুসলমান নয়!
(বুখারি-৫৩৬৩, মুসলিম-১৪০১)


তাই বিয়ে করার সামর্থ্য যার আছে তার বিয়ে করা থেকে বিরত থাকা উচিত হবে না। আর বিয়ে করা সংসার ধর্ম পালন করা ইসলামে কাজ। এবং সমস্ত নবীদের সুন্নাত তথা প্রথা অনুযায়ী প্রশংসাযোগ্য কাজ। আর যে ব্যক্তি হিজরা নয় দৈহিক দিক দিয়ে স্ত্রীকে নিয়ে ঘর করতে অপারগ নয় তার জন্য বিয়ে করা অবশ্য অপরিহার্য।

আবু হুরাইর (রাঃ) বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেছেন তিন শ্রেণীর লোকদের প্রতি আল্লাহর সাহায্য করা কর্তব্য হয়ে পড়ে।
১) যে দাস নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ আদায় করে দাসত্ব থেকে মুক্তি পেতে চায়।
২) যে বিয়ে করে নিজের নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা করতে চায়।
৩) যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে জিহাদ এ যেতে চায়।
(নাসাঈ-২৮৬৪)


এ হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লাম তিন শ্রেণীর লোকদের প্রতি সাহায্য করতে বলেছেন, তার মধ্যে একটি হচ্ছে নৈতিক পবিত্রতা রক্ষা করার উদ্দেশ্যে বিবাহকারী। হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু সাল্লাম বিবাহ এর প্রতি উদ্ধত করেছেন।

'নবী সাল্লাল্লাহু আলাই সাল্লাম বলেন, মুসলিম বান্দা যখন বিবাহ করে তখন সে তার অর্ধেক ঈমান দ্বীন পূর্ণ করে অতএব বাকি অর্ধেক অংশে সেজন্য আল্লাহকে ভয় করে
(সাহীহুল জামে-৬১৪৮)


ব্যভিচার থেকে বাঁচার জন্য পবিত্র জীবন গঠনের জন্য বিবাহ করলে দাম্পত্যে আল্লাহ সুবহানাতালা সাহায্য করেন।
(মিশকাত-৩০৮৯)

পরিশেষে আপনাদের বলতে চাই যে, যারা এখনো যুবক, যৌবনে পদার্পণ করেছেন ও যারা 'দাঈ' হিসাবে ইসলামের খাদেম হিসাবে কাজ করে যাচ্ছেন কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ কাজ টি করতে আপনার দ্বিধাবোধ ও সময় নেওয়া এটা এক ধরনের চালাকি ও দায়িত্ব থেকে পালায়ন করার একটা দিক মাত্র। আমাদের উচিত হবে আল্লাহ সুবহানাতায়ালা যা নির্দেশ দিয়েছেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু সাল্লাম এর জীবন আদর্শ অনুসরণ করার জন্য, তা থেকে জ্ঞান অর্জন করে তার পথের পথিক হওয়া। তবেই আমারা আখেরাতে নাজাত প্রাপ্ত হব। তাই আমাদের তাড়াতাড়ি বিবাহ করাটাই শ্রেয়।




Next Post Previous Post
No Comment
Add Comment
comment url